Receive up-to-the-minute news updates on the hottest topics with NewsHub. Install now.

দিনে পাঁচবার কেন নামাজ পড়তে হয়?-613337

March 14, 2018 12:07 PM
36 0
দিনে পাঁচবার কেন নামাজ পড়তে হয়?-613337

ইমান ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ। মুসলমানদের প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হয়। অন্য কোনো ধর্মে এত বেশি ইবাদত বা উপাসনা করার নজির নেই। এর কারণ কী? নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো না কোনো হেকমত ও রহস্য লুকায়িত আছে। এ বিষয়ে মৌলিকভাবে এ কথা জেনে রাখা প্রয়োজন যে ইসলামে যত ইবাদত ও আমলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এর লাভ-ক্ষতির হিসাব কষার চেয়েও মুসলমানদের কাছে এ কথা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল নির্দেশ দিয়েছেন বলেই আমরা তা আদায় করি। কোনো কোনো ইবাদতের হেকমত ও রহস্য মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল বর্ণনা করেছেন। আর কোনো কোনো ইবাদতের হেকমত ও রহস্য কোরআন ও হাদিসে বর্ণনা করা হয়নি। যেমন রোজার হেকমত বর্ণনা করে বলা হয়েছে, ‘হে ইমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের আগের লোকদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া বা পরহেজগারি অর্জন করতে পারো। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৩)

এর মাধ্যমে তুমি তাদের (সম্পদ) পবিত্র করবে এবং (তাদের গুনাহ থেকে) পরিশোধিত করবে। ’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১০৩)

নামাজ সম্পর্কে এক জায়গায় ইরশাদ হয়েছে : ‘নামাজ আদায় করো আমার স্মরণে। ’ (সুরা : ত্ব-হা, আয়াত : ১৪)

সুতরাং এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের কাছে এটাই গুরুত্বপূর্ণ যে মহান আল্লাহ এই পাঁচ সময়ে নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন, তাই আমরা সময় অনুযায়ী নামাজ আদায় করি। আল্লাহ কোনো নির্দেশ দিলে কারো জন্য এর কারণ তলব করার অধিকার নেই। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি যা করেন, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। বরং তাদেরকেই প্রশ্ন করা হবে। ’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ২৩)

তার অর্থ এই নয় যে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো হেকমত ও রহস্য নেই। কেননা আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বড় হাকিম ও প্রজ্ঞাবান। তাই তাঁর কোনো সৃষ্টি, তাঁর দেওয়া কোনো বিধান হেকমতশূন্য হতে পারে না। তাহলে কী সেই হেকমত, যার আলোকে দৈনিক নির্ধারিত পাঁচ সময়ে ফরজ নামাজ আদায় করতে হয়? যুগে যুগে ইসলামী পণ্ডিতগণ সে হেকমত ও রহস্য উদ্ঘাটনে সচেষ্ট হয়েছেন। হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) লিখেছেন : ‘পবিত্র কোরআনের এক আয়াত থেকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান দেওয়ার হেকমত, হাকিকত ও দার্শনিক ব্যাখ্যা জানা যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো সন্ধ্যায় ও প্রভাতে এবং অপরাহ্নে ও জোহরের সময়। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে সব প্রশংসা তো তাঁরই। ’ (সুরা : রুম, আয়াত : ১৭-১৮)

এশার সময় পৃথিবী নিকষ কালো অন্ধকারে ছেয়ে যায়। অন্ধকার হাজারো বিপদ-আপদের প্রতীক। দুনিয়া ও আখিরাতের সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে আশু মুক্তির জন্য এশার নামাজের বিধান দেওয়া হয়েছে, যাতে মানুষ ইবাদতের বরকতে আপদ থেকে রক্ষা পায়। ’ [আহকামে ইসলাম আকল কি নজর মে, আশরাফ আলী থানভি, পৃষ্ঠা-৭২-৭৬ (সংক্ষেপিত)]

উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠতম ইসলামী স্কলার শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.)-এর মতে, দৈনিক বারবার নামাজ আদায়ের মাধ্যমে আত্মা ও রুহের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মানুষের অন্তরকে সৃষ্টিবিমুখ ও স্রষ্টামুখী করা হয়। তাঁর ভাষায় দেখুন : ‘মুসলিম উম্মাহ যদি দৈনিক বারবার জীবন ও কর্মের হিসাব ও পর্যবেক্ষণ অব্যাহত না রাখে, তাহলে এই উম্মাহর রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো কিছুতেই সুষ্ঠু ও পরিপূর্ণ হতে পারে না। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান দিয়ে মহান আল্লাহ সে ব্যবস্থাই করেছেন। আগে থেকে নামাজের জন্য অপেক্ষা ও নামাজের পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ মূলত নামাজেরই অংশ। এভাবে দিনের অধিকাংশ সময় নামাজের গণ্ডিতে এসে পড়ে। ’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৭৮)

দারুল উলুম দেওবন্দের সাড়া জাগানো সাবেক প্রিন্সিপাল হাকিমুল ইসলাম কারি তৈয়ব (রহ.) দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের হেকমত সম্পর্কে লিখেছেন : ‘প্রভাতের সময় মানুষের আত্মা স্বচ্ছ ও সতেজ থাকে, সে সময় মুক্তমনে প্রভুর স্মরণে প্রার্থনা করার জন্য ফজরের নামাজের নির্দেশ দেওয়া হয়ছে। দুপুরের দিকে দেহকে অলসতায় পেয়ে বসে। জোহরের নামাজ তখন দেহে সতেজতা আনে। সারা দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে ক্লান্তশ্রান্ত বিকেলে একটু বিনোদন ভালো লাগে। নিজের ভেতর উদাসী মনোভাব জেঁকে বসে। সেই উদাসীনতা দূর করে আসরের নামাজ। মাগরিবের সময় দিন-রাতের পরিবর্তন হয়। পৃথিবীতে আমূল পরিবর্তন ঘটে। এ পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে মাগরিবের নামাজ হাজির হয়ে যায়। এশার পর মানুষের ওই দিনের সব কাজকর্ম সমাপ্ত করা হয়। এর পরই মানুষ রাতের কোলে ঘুমিয়ে পড়ে। তাই মানুষের শেষ কাজ যেন ভালো হয়, ‘খাতেমা বিল খাইর হয়’, সেই তাগিদে এশার নামাজের বিধান দেওয়া হয়েছে। ’ [ফলসাফায়ে নামাজ, মাওলানা কারি মুহাম্মদ তৈয়ব (রহ.), পৃষ্ঠা-৪৭]

ড. ইউসুফ আল কারজাভি (দা. বা.) তাঁর ‘আল ইবাদাতু ফিল ইসলাম’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন : “দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান রুহ ও আত্মার পবিত্রতার জন্য ‘গোসলখানা’-সদৃশ। এর মাধ্যমে মুসলমানের অন্তরকে সব ধরনের গাফিলতি থেকে পবিত্র করা হয়। মুসলমানদের পাপাচার ও ত্রুটিবিচ্যুতি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। এ কথা প্রিয় নবীর একটি হাদিস থেকে জানা যায়। তিনি বলেছেন, ‘বলো তো দেখি, কারো ঘরের দরজায় যদি একটি নদী থাকে, সে যদি ওই নদীতে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার শরীরে কোনো ময়লা থাকতে পারে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, না, তার দেহে কোনো ময়লা থাকতে পারে না। মহানবী (সা.) বললেন, এটাই হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের দৃষ্টান্ত। এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ (তাঁর বান্দাদের) গুনাহ মাফ করে দেন। ’ ” (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

এর মাধ্যমে মানুষ তার রবের দিকে ফিরে আসতে পারে। পাপাচারী ব্যক্তি জৈবিক লালসা ও কুপ্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে, আল্লাহ ও পরকাল ভুলে সে যে আজাবের যোগ্য হয়ে গেছে—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সে আজাবের আগুন নিভিয়ে দিতে সাহায্য করে। এ কথাও এক হাদিস থেকে জানা যায়। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর নির্ধারিত ফেরেশতা আছেন, যিনি প্রতি ওয়াক্ত নামাজের সময় ঘোষণা দিতে থাকেন, হে আদম সন্তান! এগিয়ে যাও সে আগুনের দিকে, যা তোমরা প্রজ্বালন করেছ। অতঃপর সে আগুন নিভিয়ে দাও। ’ (তাবরানি, সনদ সহিহ)

মাগরিবের নামাজের পর রাত আঁধার হতে শুরু করে। সে সময় আওয়াবিন নামাজ পড়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া কোনো নিয়ামতপ্রাপ্ত হলে শোকরিয়ার নামাজ, কোনো পাপ কাজ করে ফেললে তাওবার নামাজ পড়ার বিধান দেওয়া হয়েছে। বান্দা যখন কোনো বিশেষ প্রয়োজনের সম্মুখীন হয় বা কোনো প্রয়োজন পূরণ হওয়ার ইচ্ছা করে কিংবা অভাব-অনটনে পড়ে, তখন সালাতুল হাজাত পড়তে বলা হয়েছে। যখন কেউ এমন কোনো কাজ করার ইচ্ছা করে, যার ভালো-মন্দ ও শুভ-অশুভ নিশ্চিত জানা নেই, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ইস্তেখারার নামাজ পড়তে বলা হয়েছে। এভাবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন নতুন নামাজ পড়তে বলা হয়েছে। তবে ফরজ নামাজের জন্য বিশেষ পাঁচটি সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। পাঁচ সংখ্যাটি বেছে নেওয়ার কারণ কেউ কেউ এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে ফরজ নামাজ আসলে ৫০ ওয়াক্ত ছিল। মেরাজের রাতে মহানবী (সা.) আল্লাহর কাছে আবেদন করে করে তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করে দেন। অথচ আমরা জানি যে আল্লাহর বিধান পরিবর্তন হয় না। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আমার কথার রদবদল হয় না। ’ (সুরা : ক্বফ, আয়াত : ২৯)

তাই একদিকে আল্লাহর প্রিয় বান্দার আবেদন, অন্যদিকে আল্লাহর অপরিবর্তনীয় বিধান—এ অবস্থায় আল্লাহ ৫০ ওয়াক্তকে পাঁচ ওয়াক্ত করে দিয়ে তাঁর হাবিবের আবেদন কবুল করেছেন। আবার এক ওয়াক্ত নামাজের বিনিময়ে ১০ ওয়াক্তের সওয়াব দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তাঁর অপরিবর্তনীয় বিধান বলবৎ রেখেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘কেউ কোনো নেক কাজ করলে তার ১০ গুণ (প্রতিফল) পাবে। ’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৬০)

এ ছাড়া পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় নির্ধারণের হেকমত সম্পর্কে বলা হয় যে সেগুলো বিভিন্ন নবীর আমল ছিল। যেমন—আঁধার রাতে আদম (আ.) দুনিয়ায় নিক্ষিপ্ত হন। ফজরের সময় তিনি আলোর ছোঁয়া দেখে শোকরিয়াস্বরূপ দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। আল্লাহ তাআলা তা এ উম্মতের ওপর অবতীর্ণ করেছেন। জোহরের চার রাকাত হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর স্মারক। নবী হওয়ার আগে সে সময় তিনি আল্লাহর সন্ধান লাভ করেছেন। আসরের চার রাকাত হজরত ইউনুস (আ.)-এর আদর্শ। মাছের পেট থেকে রক্ষা পেয়ে তিনি চার রাকাত নামাজ আদায় করেছেন। মাগরিবের তিন রাকাত হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত। এ সময় তিনি তাঁর হারানো পুত্র ইউসুফ (আ.)-এর সন্ধান পেয়ে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিন রাকাত নামাজ আদায় করেন। এশার সময় ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে মুসা (আ.) চার রাকাত নামাজ আদায় করেছেন। তাই উম্মতে মোহাম্মদির প্রতি এশার বিধান দেওয়া হয়েছে। [সূত্র : মেরি নামাজ, মাওলানা মুহাম্মদ ইদ্রিস (রহ.)]

উত্স: kalerkantho.com

সামাজিক নেটওয়ার্কের মধ্যে শেয়ার করুন:

মন্তব্য - 0